অনিন্দ্য সাদা পাথর

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে, বলেছিলো: এ নদীর জল, তোমার চোখের মতো ম্লান বেতফল। সব ক্লান্তির রক্তের থেকে, স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি, এ নদী তুমি। জীবনানন্দের অমর কবিতার এ লাইনগুলো মূহুর্তেই মনে পড়ে যায় হীমশীতল পানির পরশে। যাত্রা পথের ক্লান্তি নিমিষেই ভুলিয়ে দিয়ে অনিন্দ্য এক আনন্দের বন্যায় ভরিয়ে তুলবে হৃদয় ও মন। বলছি, সাদা পাথরের কথা।

সিলেটের অন্যতম এক দর্শনীয় জায়গা হয়ে ওঠা এই স্থান নিয়ে থাকছে আজকের আয়োজন। ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি, দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ সিলেট। আগে আমাদের দেশের মানুষ সিলেটকে চিনতো শাহজালাল (রঃ), শাহপরান (রঃ) এর মাজারকে। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। এখন সিলেট বলতেই মানুষের মুখে চলে আসে বিছনাকান্দি, রাতারগুল, জাফলং, চা বাগান, লালাখাল ইত্যাদির নাম। এই নামগুলোর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর।

মেঘালয়ের বড় বড় পাহাড় থেকে ধেয়ে আসা ঝর্ণার পানি থেকে উৎপত্তি হয়ে ধলাই নাম ধারণ করে সিলেট হয়ে বাংলাদেশে ঢোকা মনোলোভা রূপ, চির সবুজ পাহাড় বন্দী এলাকা জুড়ে অজস্র পাথর, আকাশের নীল ছায়া রেখে যায় পাথরে জমে থাকা স্ফটিক জলে। দূরের পাহাড়গুলোর উপর মেঘের ছড়াছড়ি, সাথে একটা দুটো ঝর্ণার গড়িয়ে পড়া। নদীর টলমলে নীল হাঁটু সমান পানির তলায় ছোট-বড় পাথরের গালিচা। চিক চিক করা রূপালী বালু আর ছোট-বড় সাদা অসংখ্য পাথর মিলে এ যেন এক পাথরের রাজ্য। প্রকৃতির খেয়ালে গড়া নিখুঁত ছবির মত সুন্দর এই জায়গাটির নাম ভোলাগঞ্জ।

জাফলং, বিছানাকান্দিতে তো অনেকেই গিয়েছেন, এবার ঘুরে আসুন অনিন্দ্য সুন্দর ভোলাগঞ্জ থেকে। সিলেটের কোম্পানিগঞ্জের ভোলাগঞ্জ দেশের বৃহত্তম পাথরকোয়ারী অঞ্চল। সিলেট থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। অসাধারণ প্রাকৃতিক শোভার স্থান এই ভোলাগঞ্জ। সাথে বাড়তি পাওনা হিসেবে পাবেন ধোলাই নদীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। চারদিকে শুধু সাদারঙা পাথর আর পাথর। এতো সাদা পাথর হয়ত জীবনে কখনোই দেখেননি। পাথর তোলার প্রচুর নৌকা দেখতে পাবেন এখানে। নির্জন নৈসর্গিক এই জায়গাটিতে সামনে সবুজ পাহাড়ের সারি, পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচণ্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল জল। এই জলে অবগাহন করে সকল ক্লান্তি-অবসাদ নিমিষেই দূর করতে পারবেন। মন-প্রাণ হয়ে উঠবে সতেজ ও প্রাণবন্ত। পানি আর সাদা পাথরের জাদুকরী শীতল স্পর্শ আপনাকে নিঃসন্দেহে বিমোহিত করবে।

কী দেখবেন: সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানিগঞ্জে অবস্থিত ভোলাগঞ্জ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে বন্যার তোড়ে নদী ও ছড়া দিয়ে প্রচুর পাথর ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে জমা হয়। যা সারা বছর উত্তোলন করে থাকেন শ্রমিকরা। এই পাথুরে রাজ্য যেমন চমৎকার তেমনিই উপভোগ্য এখানকার পাথর উত্তোলনের দৃশ্য। ভোলাগঞ্জের আর একটি আকর্ষণীয় স্থান হলো ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে।

পাথর কোয়ারী, পাহাড়ি মনোলোভা দৃশ্য অবলোকনের পাশাপাশি ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকা ঘুরে দেখতে পারেন। ১৮৬৪ সালে সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্রকল্প। মজার ব্যাপার হলো, এলাকাটি দেখতে অনেকটা ব-দ্বীপের মতো। ধলাই নদী বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে প্ল্যান্টের চারপাশ ঘুরে আবার একীভূত হয়েছে। রোপওয়ের এরিয়া প্রায় একশ একর। আর এ কারণেই স্থানটি পর্যটকদের কাছে এত আকর্ষণীয়।

এদিকে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল এলাকা চেরাপুঞ্জির অবস্থান ভারতের পাহাড়ি রাজ্য মেঘালয়ে। ধলাই নদীর উজানে এ রাজ্যের অবস্থান। মেঘালয়ের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় ঘেরা এ রাজ্যের দৃশ্য অসাধারণ। ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকায় অবস্থান করে পাহাড় টিলার মনোরম দৃশ্যাবলী অবলোকন করা যায়। সবুজে মোড়া পাহাড়ি এই সৌন্দর্য আপনাকে বিমুগ্ধ করবেই করবে।

এছাড়া ভোলাগঞ্জে রয়েছে একটি ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন। এ স্টেশন দিয়ে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম চলে। এ স্টেশন দিয়ে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা প্রধানত চুনাপাথর ও কয়লা আমদানি করে থাকেন। চুনাপাথর নিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সীমান্তের জিরো লাইনে এ কাস্টমস স্টেশনের অবস্থান। চাইলে এখান থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। এছাড়া ভোলাগঞ্জের মূল আকর্ষণ হলো সাদা পাথরের নীল স্বচ্ছ জলরাশিতে জলকেলি করা। দেশের যেকোনো স্থান থেকে যাওয়ার যে ক্লান্তি শরীরকে অবসাদে ঠেলে দিবে, এর স্বচ্ছ হীমশীতল পানি মূহুর্তেই সব নাই করে দিবে। এত চমৎকার ঠান্ডা পানিতে যেই আপনি আপনার পা ভেজাবেন, সারা শরীরে এক শিহরন খেলে যাবে নিশ্চিত। সেই পানির স্নিগ্ধতা আপনাকে মুগ্ধ করে দিয়ে যাবে। আপনার ক্লান্তি, অবসাদ যে কোথায় হারিয়ে যাবে তা টেরই পাবেন না হলফ করে বলতে পারি।

কখন যাবেন: সাধারণত সিলেটের এই স্থান মেঘালয়ের বড় বড় পাহাড়গুলোর উপরে নির্ভরশীল। বৃষ্টির পানি থেকে উৎপন্ন ঝর্ণার স্রোতধারায় বয়ে আসা স্নিগ্ধ জলরাশিই মূলত সাদা পাথরের আকর্ষণ। তাই বর্ষার সিজন হলো সবথেকে উত্তম সময়। আমাদের এই উপমহাদেশে সাধারণত মে থেকে অক্টোবর বর্ষা চলে। তাই এ সময়ে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর গেলে সর্বোচ্চ আনন্দ পাওয়া যায়।

কিভাবে যাবেন: বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সিলেটে যেতে হবে। সিলেটে যাওয়ার জন্য সড়ক, রেল ও আকাশপথ এই তিন পথই ব্যবহার করা যায়। সড়কপথে ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ, গাবতলি ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। এ পথে গ্রিন লাইন পরিবহন, এনা পরিবহন, সৌদিয়া এস আলম পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, এনা পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ইউনিক সার্ভিস এর এসি ও নন-এসি বাস চলাচল করে। ভাড়া পড়বে নন-এসি ৪০০ ও এসি ১১০০ টাকা।

এছাড়া কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকেও আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেস এ চড়ে যেতে পারেন সিলেটে। সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা। ভাড়া ২৫০-৬০০ টাকার মধ্যে। বিমানে প্রতিদিন ফ্লাইট চলে সিলেট রুটে। ঢাকা থেকে বিমানে চড়ে ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় সিলেটে।

সিলেট শহর থেকে ভোলাগঞ্জ যাবার কোনো বাস বা লেগুনা নেই। যাতায়াতের একমাত্র বাহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, জনপ্রতি ভাড়া ২৫০ টাকা। রাস্তা এত খারাপ যে বর্ণনার অযোগ্য। সে ক্ষেত্রে নদীপথে যাওয়াই ভালো। এই পথে জনপ্রতি খরচ ২০০ টাকা। সংখ্যায় বেশি হলে ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে যেতে পারেন। ভাড়া নেবে ছয় হাজার টাকা যাওয়া-আসা। যাতায়াত সময় সড়কপথের মতোই নদীপথেও তিন ঘণ্টার মতো। দিনে গিয়ে দিনেই ফেরত আসা যাবে। মনে রাখবেন ভোলাগঞ্জ থেকে সিলেট বাধাঘাটের শেষ ট্রলার ছেড়ে আসে বিকেল চারটায়। সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপারটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে। ট্রলার মিস করলে সড়কপথ ভরসা, সে ক্ষেত্রে দুর্বিষহ যন্ত্রণা পোহাতে হবে। আর নদীপথে যাতায়াতে একটু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখবেন।

থাকবেন কোথায়: জেলা পরিষদের একটি রেস্ট হাউজ আছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তত্ত্বাবধানে। থাকতে হলে আপনাকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া ভোলাগঞ্জ বা কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় থাকার তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। ভোলাগঞ্জ ভ্রমণ শেষে আপনি সিলেটে এসে অবস্থান করতে পারবেন। ভোলাগঞ্জ না থেকে যদি সিলেটে চলে আসেন তবে তো কোনো চিন্তাই নেই। দরগা গেটে অসংখ্য হোটেল আছে। বিভিন্ন মানের এবং দামের। রুচি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী উঠে পড়ুন একটিতে।

কী খাবেন: ভোলাগঞ্জে খাবারের তেমন কোনো ভালো হোটেল নেই। যে হোটেলগুলো আছে তাতে সাধারণ মানের খাবার পাওয়া যায়। দামও মোটামুটি একইরকম হয়ে থাকে। বেশিও না, কমও না। তবে শুকনো কিছু খাবার নিয়ে যেতে পারেন। সেগুলো দিয়ে পেট চালিয়ে নিয়ে যদি সিলেটে চলে আসেন তবে তো আপনি খাবার রাজ্যে চলে আসলেন। পানশি, পাঁচভাই, ভোজনবাড়ি, পালকি, ব্রিকলেন এত এত রেস্টুরেন্ট আছে যে কোনো একটাতে বসে পড়ুন। আর পেটপুঁজো করে নিন ইচ্ছামতো। আর হ্যাঁ! সিলেটের এসব হোটেলের খাবারের দাম বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের খাবারের হোটেল থেকে কম সে ব্যাপারে তো আর না বললেও চলবে।

নাগরিক ব্যস্ততা থেকে মনকে মুক্তি দিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন সিলেটের অনিন্দ্য সুন্দর এই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর থেকে। এখানে আপনি যেমন পাবেন সবুজের উচ্ছ্বাস, তেমন পাবেন নির্মল বাতাস। আর সাদা পাথরের ঠান্ডা হিমিকার জলের কথা তো আগেই বলেছি। আপনার যাত্রা পথের ক্লান্তি তো ভুলিয়ে দিবেই, সাথে এর রেশ আপনার মনে গেঁথে থাকবে বহুদিন।

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ