দেখে আসুন চীনা মাটির পাহাড় আর সবুজ পানির লেক

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে দেশ আমার জন্মভূমি। কবির কথা গান হয়ে আমাদের মাঝে ঘুরে বেড়ায় এখনো। গানের লাইন দুটি অমর হয়ে আছে। গানের এই কথার সাথে আমাদের দেশের চিত্র মিলে যায় একদম। আমাদের বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গায় রয়েছে দেখার মতো অপরুপ দৃশ্য। প্রতিটি কোনায় কোনায়, প্রতিটি স্থানে আছে প্রকৃতির অপার হাতছানি। তেমনই একটি হলো নেত্রকোণার দূর্গাপুর। বাংলাদেশে যে কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ট্যুরিস্ট স্পট আছে তার মধ্যে এটি একটি। প্রত্যকের অন্তত একবার হলেও এই জায়গাটা ঘুরে আসা উচিত, দেখুন কত সব বিচিত্র ও নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি আমাদের দেশে ।

কী দেখবেন: সুসং দুর্গাপুর। নেত্রকোনা জেলার উত্তর প্রান্তে গারো পাহাড়ের পাদদেশের এক জনপদের নাম। যেখানে বয়ে গেছে টলটলে জলের সোমেশ্বরী আর দিগন্ত হারিয়েছে আকাশ ছোঁয়া সবুজ পাহাড়ে। ছোট্ট একটি জায়গা যার পরতে পরতে জড়ানো সৌন্দর্য। এছাড়াও সুসং দুর্গাপুরে দেখতে পারবেন গারো পাহাড়, সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী,টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, সাদা মাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদী, কংশ নদী, আত্রাখালি নদী। সুসং দুর্গাপুর বাজার থেকে রিক্সা বা মোটরসাইকেল নিয়ে সুনীল সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে, গারো পাহাড়, গোলাপী পাহাড়, নীল/সবুজ পানির লেক ঘুরে আসা যায়। সেখানে ভারত বাংলাদেশ বর্ডার ছাড়াও দেখার মতন রয়েছে একটা চার্চ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ট্রেনিং নেয়ার জন্য তৈরী কয়েকটা পিলার । সারাদিনের জন্য রিক্সা ভাড়া পড়বে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে (যার থেকে যা রাখতে পারে)। রিক্সা আপনাকে খুঁজতে হবেনা, রিক্সাই আপনার হোটেলে এসে বসে থাকবে। আর মোটর সাইকেল ভাড়া পাওয়া যাবে তালুকদার প্লাজা/ অগ্রণী ব্যাংক এর সামনে থেকে।

শীত কালে যখন পানি কম থাকে তখন সোমেশ্বরী নদীতে হাটু পানিতে নেমে হাটা হাটি করবেন। ফিলিংস টা দুর্দান্ত হবে।

কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে দূর্গাপুর যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সড়কপথ। এছাড়া রেলপথেও যাওয়ার খুব ভালো ব্যবস্থা আছে। ঢাকা থেকে সুসং দুর্গাপুরে যাওয়ার এবং ফেরার জন্য সবচাইতে ভালো হবে নাইট কোচ বাস সার্ভিস। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সুসং দুর্গাপুরে উদ্দেশ্যে নাইট কোচ সহ দিনে ও রাতে বেশ কিছু বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া পড়বে ৩০০ টাকা। এই বাস সুসং দুর্গাপুর এর প্রাণকেন্দ্র তালুকদার প্লাজার সামনে নিয়ে নামাবে।
রাত ১২ টায় মহাখালী টার্মিনাল থেকে নাইট কোচ ছেড়ে যায়। আগে থেকে যোগাযোগ করে টিকিট বুকিং দিয়ে রাখলে ভালো। আবার ঢাকা ফেরার জন্য দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র তালুকদার প্লাজার সামনে থেকে রাত এগারটায় এবং সাড়ে এগারটায় দুটি নাইট কোচ ঢাকার উদ্দ্যশ্যে ছেড়ে যায়। আপনি এখান থেকে টিকিট সংগ্রহ করে বাসে যেতে পারেন। ভোর পাঁচটার মধ্যেই মহাখালী পৌঁছে যাবেন। নির্ঝঞ্ঝাট এবং নিরাপদ ভ্রমন এর জন্য এটাই সবচেয়ে ভাল সাজেশান।

টিকিট বুকিং এর ফোন নাম্বারঃ
ঢাকা কাউন্টার: 01917710008 (এরশাদ)
সুসং দুর্গাপুর কাউন্টার: 01711669774 (শিপার)

যারা ঝটিকা সফর করতে চান তাদের জন্য সবচেয়ে ভাল হবে নাইট কোচে দুর্গাপুর এসে তালুকদার প্লাজার সামনে থেকে সারাদিনের জন্য বাইক ভাড়া করে(ভাড়া ৮০০/১০০) সবকিছু ঘুরে দেখে আবার নাইটকোচে ফেরত যাওয়া।

বিআরটিসির একটি স্পেশাল বাস প্রতিদিন বিকাল ৩.২০ তে কমলাপুর বিআরটিসি কাউন্টার থেকে ছেড়ে যায় যা ছয় ঘন্টার মধ্যে আপনাকে সুসং দুর্গাপুরের একবারে প্রানকেন্দ্র উকিলপাড়া মোড় এর তালুকদার প্লাজা/ অগ্রণী ব্যাংক এর সামনে পর্যন্ত নিয়ে যাবে। কিন্তু স্থানীয় পরিবহন রাজনীতির কারনে প্রায়ই বাসটির সার্ভিস বন্ধ থাকে।

যারা ট্রেনে যেতে চান তাদের জন্যও ট্রেনের ব্যাবস্থা আছে। আন্তঃনগর ট্রেনে নেত্রকোণার দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত যেতে পারেন। ময়মনসিংহ পর্যন্ত রেল এর ভাড়া প্রথম শ্রেণী ১৮০ টাকা, চেয়ার কোচ ১৩০ টাকা এবং শোভন ১১০টাকা।

ঢাকা থেকে নেত্রকোনা পর্যন্ত পাঁচটি আন্তঃনগর ট্রেন চলে। কমলাপুর স্টেসন থেকে এগুলো যাত্রার সময়সূচি হলঃ

ট্রেনের নাম ছাড়ার সময়, দেওয়ানঞ্জ জংশনে পৌঁছে, সাপ্তাহিক বন্ধ

তিস্তা এক্সপ্রেস সকাল ৭.২০ সকাল ১০.৪৫ – ১১.০০ সোমবার

অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস সকাল ৯.২০ দুপুর ১.০০ – ১.৩০ নাই

যমুনা এক্সপ্রেস বিকাল ৪.৪০ রাত্রি ৮.০০- ৮.৩০ নাই

ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস সন্ধ্যা ৬.০০ রাত্রি ১০.০০ নাই

হাওর এক্সপ্রেস রাত ১১.৫০ রাত ৩.০০ বুধবার রাত।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ

আপনারা যারা চিনামাটির পাহাড়, গারো পাহাড় বা সোমেশ্বরী নদী বলতে বিরিশিরি বুঝেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, বিরিশিরি একটি ইউনিয়ন। দূর্গাপুর থানার একটি ইউনিয়ন বিরিশিরি । চিনামাটির পাহাড়, রানিখং, সীমান্ত, সোমেশ্বরী নদী আরও যা দেখবেন সবই দূর্গাপুর থানার অন্তর্গত এবং অন্যান্য ইউনিয়নে। আপনি বিরিশিরি ইউনিয়নের কোন কিছুতেই ঘুরবেন না- ফসলি মাঠ আর চোলাই মদ এর কারখানা ছাড়া বিরিশিরিতে আর কিছুই নেই। বেড়াতে যান দূর্গাপুর কিন্ত নাম হয় বিরিশিরির। বিরিশিরি তে বাস/নসিমন এসে থামে এতটুকুই।

দুর্গাপুর থেকে পাহাড়ে যাওয়ার উপায়: বিজয়পুর, রানীখং, বিজিবি ক্যাম্প এসব ঘুরতে রিক্সা অথবা মোটর সাইকেল ভাড়া করতে হবে। সোমেশ্বরী নদী পাড় হয়ে ওপাশে যেতে হবে। নদী পাড় হতে নৌকাকে দিতে হবে জনপ্রতি ৫ টাকা। আর মটর সাইকেল এর জন্য ১০ টাকা। মটর সাইকেল এ গেলে সব ঘুরে আসতে ৬ ঘন্টা মত সময় লাগবে। ১ টা মটর সাইকেলে ২ জন এর ভাড়া পড়বে ৭০০-১০০০ টাকা। আর রিক্সায় গেলে ২ জন এ খরচ পড়বে ৬০০-৮০০০ টাকা(যার কাছ থেকে যত রাখতে পারে)। ফিরতে সময় লাগবে ৮ ঘন্টা মত। তবে বর্ডারের রাস্তা ঘাট খুব সুবিধের না হওয়ায় মাটর সাইকেলে গেলেই ভাল হবে। আর ভবানিপুর ডাহাপাড়া যেতে হলে আত্রাখালি ঘাট হতে রিক্সা নিয়ে যাওয়া যায়। ১-১.৫ কিলোমিটার রাস্তা। চাইলে প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে হেটেও যেতে পারবেন।

থাকার ব্যবস্থা: সুসং দুর্গাপুরে থাকার জন্য ভাল মানের বেশ কয়েকটি গেস্ট হাউস আছে। নিম্নে এদের নাম এবং কন্টাক্ট নাম্বার দেয়া হল-

জেলা পরিষদ ডাক বাংলা: 01558380383, 01725571795

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী গেষ্ট হাউজ। ফোনঃ 09525-56042; মোবাইলঃ 01815482006

ইয়ুথ মেন খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন বা ওয়াইএমসিএ-এর রেস্ট হাউস।: 01818613496, 01716277637, 01714418039, 01743306230, 01924975935, 01727833332। এখানকার কক্ষ ভাড়া ৩০০-৫০০ টাকা।

YWCA গেষ্ট হাউজ: 01711027901,।YWCA এর জন্য ‘অমিতা সাংমা – ০১৭১২০৪২৯১৬’

রুম ভাড়া পড়বে ৭৫০ টাকা (২ বেড) আর চাইলে VIP রুম এর ব্যবস্থাও করতে পারেন। এদের বিরাট একটা হলরুম আছে যেখানে একসাথে ১৮ জন থাকতে পারবে, সেক্ষেত্রে পার বেডে খরচ পড়বে ২০০ টাকা করে। YWCA এর ছাদটা সবচাইতে সুন্দর, সেখান থেকে পূর্ণিমা দেখতে অসাধারণ লাগে
অন্যান্য গেস্ট হাউসঃ
এছাড়া দুর্গাপুরে আরও কিছু মধ্যম মানের হোটেল আছে,
স্বর্ণা গেস্ট হাউস ………………………………………01712284698, ০১৭২৮৪৩৮৭১২
হোটেল সুসং ……………………………………………০১৯১৪৭৯১২৫৪
হোটেল গুলশান ……………………………………….০১৭১১১৫০৮০৭
হোটেল জবা. …………………………………….01711186708, 01753154617
নদীবাংলা গেষ্ট হাউজ ……………………………01771893570, 01713540542)

এসব হোটেলে ১৫০-৪০০ টাকার মধ্যে থাকার ব্যাবস্থা আছে।

আপনি বনে জঙ্গলে থাকতে এসে পাচ তারকা হোটেল এর সার্ভিস আশা করতে পারেন না। তবে আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি তাদের আন্তরিকতা এবং সেবা আপনাদের ভাল লাগবেই।

খাওয়া দাওয়া: খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা নিয়ে আপনাদের একেবারেই চিন্তা না করলেও চলবে। যে গেস্ট হাউস এ থাকবেন তারাই সুলভ মুল্যে ভাল খাবারের ব্যাবস্থা করে দিবে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক/তালুকদার প্লাজার সামনে অবস্থিত হোটেল শান্ত এবং হোটেল পুস্প তে ভাল মানের এবং সুলভ মুল্যে খাবার পাওয়া যায়।

সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিন রাতে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে যান। বাস অথবা ট্রেন ধরুন নেত্রকোনা যাওয়ার। আর ঘুরে আসুন প্রকৃতির অপার বিষ্ময় নিয়ে গড়ে ওঠা দূর্গাপুরের অসাধারণ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সম্বলিত সুসং দূর্গাপুর। হ্যাপি জার্নি

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ