নিকলীর হাওরের অপার সৌন্দর্য

হাওর মানেই চারদিকে বিস্তৃত জলরাশি।মাঝখানে নিঃসঙ্গ প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকা হিজল-করচ গাছ। কিছুদূর পর পর পানিতে দ্বীপের মতো ভেসে থাকা ছোট ছোট গ্রাম। ছোট ডিঙিতে মাছ ধরায় মগ্ন জেলের দল।

নিকলীর হাওরও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।বরং এখানে আছে আরও কিছু বাড়তি অনুষঙ্গ। মূল সড়ক থেকে হাওরের বুক চিড়ে বহুদূর চলে গেছে সাব-মার্সিবল রোড নামের রহস্যময় পাকা সড়ক।যেন বিশাল সুইমিংপুলে আনন্দে সে ভিজিয়েছে গা। চাইলে এই সড়ক ধরে চলে যাওয়া যায় বহু দূর পথ। কোনো খানাখন্দ নেই,নেই চোরাবালি বা চোরা কাদায় ডুবে যাওয়ার ভয়। নৌকায় হাওরে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি চাইলেই ঘুরে আসা যায় ছোট্ট জলাবন।


প্রিয় পাঠক, সোশ্যাল মিডিয়ায় সহজেই আমাদের আর্টিক্যাল পেতে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকতে পারে আমাদের অফিসায়াল ফেসবুক পেজে। আর আমাদের ফেসবুক গ্রুপের সদস্য হয়ে শেয়ার করতে পারেন আপনার চমৎকার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, মনকাড়া ছবি ও ভিডিও


কেন যাবেন নিকলী

নানা কারণে আপনি ঘুরে আসতে পারেন নিকলীর হাওর। আপনি যদি ভ্রমণপোঁকা বা সৌন্দর্য পিয়াসী হয়ে থাকেন,তাহলে এমন চমৎকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‌আপনাকে টানবেই।

ভ্রমণ যদি আপনার প্রধান শখের তালিকায় না-ও থেকে থাকে তবু আপনি ঘুরে আসতে পারেন জলে ভেজা সতেজ বাতাসের নিকলী থেকে। নাগরিক জীবনের নানা টানাপোড়েন,প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততা,মানসিক চাপ,ট্রাফিক জ্যাম-দূষণে ক্লান্ত জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে একটু রিচার্জ হওয়া খুবই জরুরী। নিকলীর হাওর তাজা জল-বাতাস,সুনীল আকাশ আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য শুষে নিতে পারে আপনার সব ক্লান্তি, অবসান।হয়ে উঠতে পারেন চনমনে,চাঙ্গা।

হাওর হচ্ছে বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত ভৌগোলিক অঞ্চল। এ অঞ্চল প্রায় ৬ মাস পানিতে ডুবে থাকে,বাকী ৬ মাস থাকে জেগে।স্বাভাবিক কারণেই হাওরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন,এখানকার সংস্কৃতি,খাদ্যাভ্যাস,জীবনযাপন প্রণালী অন্য এলাকার চেয়ে বেশ ভিন্ন। তাই হাওর ভ্রমণ আপনাকে দিতে পারে বিরল এক অভিজ্ঞতা।

হাওরের স্বাদ নেওয়ার সহজ উপায় হচ্ছে নিকলীর হাওরে ভ্রমণ। কারণ এটি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের একটি বড় অংশের মানুষের জন্য তুলনামূলক হাতের নাগালে। হাওরের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত টাঙ্গুয়ার হাওর বেশ দূরে। টাঙ্গুয়ার হাওরের তুলনায় নিকলীর হাওরে বেড়াতে তাই সময় ও অর্থ-দুটোই কম লাগে। বাড়তি পাওনা হচ্ছে সাবমার্সিবল রোড ও ছাতিরচরের জলাবন।

ছাতিরচরের জলাবন

নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের করচবন নিকলী হাওরে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।নিকলী সদর থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিলেই দেখা মেলে সারি সারি করচ গাছের,যার অর্ধেক পানিতে নিমগ্ন।ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকায় করে গাছের সারির ফাঁক ধরে ঘুরে বেড়াতে পারেন,খেলতে পারেন লুকোচুরি।

নৌকা ভাড়া

সাধারণত এক ঘণ্টার জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেয়। আবার কয়েক ঘণ্টার জন্য নিতে পারেন প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকার মতো করে। তবে ভর মৌসুমের শুক্র-শনি ও সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া বেশ বেড়ে যায়। ছাতিরচর যাওয়া-আসা এবং সেখানে এক ঘন্টা অবস্থানের জন্যে নৌকার ভাড়া পড়তে পারে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।

নিকলীতে খাবারের ব্যবস্থা

নিকলীতে ‘অভিজাত’ অথবা বড়সড় কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট নেই। বাজারে যে তিনচারটি রেস্তোরা আছে, সেগুলোই ভরসা। তবে আকারে এগুলো ছোট হলেও খাবারের মান কিন্তু মন্দ না। বিশেষ করে হাওরের তাজা মাছের তরকারি দিয়ে গরম ভাতের স্বাদ কখনো কখনো অমৃতের মতো মনে হতে পারে।

নিকলীর রেস্তোরায় গরুর মাংস বা মুরগী জাতীয় খাবার না খাওয়া ভাল। কারণ এতে কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু হাওরের মাছ না খেলে আপনি বেশ মিস করতে পারে। সবচেয়ে ভাল হয়,আপনি যদি বড় মাছের পরিবর্তে ছোট মাছের তরকারি খেতে পারেন। হাওরের তাজা ছোট মাছের স্বাদ হয়তো সারাজীবনই আপনার জিভে লেগে থাকতে পারে।

রাত কাটাতে পারেন নৌকায়

চাইলে কোনো ভরপূর্ণিমার রাতে নৌকায় কাটিয়ে দিতে পারেন একটি আস্ত রাত। হাওরের মৃদুমন্দ ঢেওয়ের দুলুনী,জলের ভাঁজে ভাঁজে তরল রূপার আভা,ভেজা বাতাসের আদর মাখানো ছোঁয়া-সব মিলিয়ে ডুবে যেতে পারে অচেনা স্বর্গীয় অনুভবে।

তবে নৌকায় রাত কাটাতে হলে দুটি বিষয় আপনার নিশ্চিত করা দরকার। প্রথমত:হাওরের মাঝখানে রাত কাটানো ঠিক হবে না। নৌকা রাখতে হবে ভেরি বাঁধের পাশে। দ্বিতীয়ত:অবশ্যই থানা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করে রাখতে হবে। এখানে সাধারণত পর্যটকরা নৌকায় রাত্রি যাপন করে না। রাতে পানিতে একটি বা দুটি নৌকার অবস্থান বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

থাকতে পারেন হোটেলেও

কোনো আবাসিক হোটেল না থাকায় এতদিন নিকলীতে রাতে অবস্থান করা বেশ দুরুহ ছিল। সম্প্রতি এখানে একটি হোটেল চালু হয়েছে। তবে এর সিট সংখ্যা একেবারেই কম। তাই রাতযাপনের পরিকল্পনা থাকলে আগেই যোগাযোগ করে যাওয়া অথবা নিকলীতে নেমেই হোটেল বুকিং দিয়ে যাওয়া ভাল।

কীভাবে যাবেন

নানাভাবে নিকলী যাওয়া যায়।তবে যেভাবে যেতে চান না কেন ভৈরব-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের একটি অংশকে ব্যবহার করতে হবে। ঢাকা থেকে যেতে চাইলে ট্রেন,বাস অথবা নিজস্ব গাড়িতে করে যাওয়া যেতে পারে।অনেক তরুণ ট্রাভেলার ঢাকা, গাজীপুর-এমনকি আরও দূর থেকে মোটরসাইকেলে করে নিকলীতে চলে যায়।

বাসে যেতে চাইলে সহজ উপায় হচ্ছে রাজধানীর সায়েদাবাদের পাশে গোলাপবাগ থেকে কিশোরগঞ্জগামী অনন্যা সুপার পরিবহনের বাসে করে পুলেরঘাট বাসস্টপেজ পর্যন্ত যাওয়া। সেখান থেকে সিএনজিতে সরাসরি নিকলী। তবে এসব সিএনজি নিকলী বাজার পর্যন্ত যায়। হাওরে যাওয়ার বেশিরভাগ নৌকা ছাড়ে মোহরকোনা থেকে। তাই নিকলী বাজার থেকে ইজিবাইকে করে মহরকোনা যেতে হবে।

ভৈরব হয়েও নিকলী যাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ট্রেনে বা বাসে ভৈরব এসে সিএনজিতে করে সরাসরি নিকলী যাওয়া যাবে। রাজধানীর কমলাপুর থেকে সোহাগ,রয়েলসহ একাধিক পরিবহনের আরামদায়ক বাসে ভৈরব যাওয়া যায়।

অনন্যা সুপার পরিবহনে ঢাকা থেকে পুলেরঘাটের ভাড়া ২২০ টাকা। সময় লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা।পুলেরঘাট থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে ১ ঘণ্টায় নিকলী বেড়িবাঁধ। সিএনজিতে জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা।

কমলাপুর থেকে ভৈরবের বাস ভাড়া ২শ টাকা।আর ভৈরব থেকে নিকলী পর্যন্ত মাথাপিছু সিএনজি ভাড়া ৬০ টাকা।বাসে ভৈরব পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। আর ভৈরব থেকে নিকলী পর্যন্ত সিএনজিতে সময় প্রয়োজন হয় প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা।

রাজধানীর মহাখালি থেকেও ভৈরবগামী বাস পাওয়া যায়। তবে এই বাসগুলো তুলনামূলক ছোট ও কম আরামদায়ক।

প্রাইভেট কারে আসতে চাইলে ঢাকা থেকে ভৈরব হয়ে কটিয়াদি বাসস্ট্যান্ডের কাছ দিয়ে ডানে নিকলীর পথে চলে যেতে হবে।ভৈরব পর্যন্ত না এসে ইটাখোলা দিয়ে আড়াআড়ি পথেও কটিয়াদি যাওয়া যায়।এ ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ মিনিটের মত সময় কম লাগে।

ট্রেনে ঢাকা থেকে নিকলী যেতে চাইলে সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে কিশোরগঞ্জগামী  এগারসিন্দুর প্রভাতিতে যাওয়া।

ভ্রমণের উপযোগী সময়

নিকলীর হা্ওরে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। জুনের শেষভাগ থেকে অক্টোবরের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সময়ে হাওরের পরিপূর্ণ রূপ পাওয়া যায়।

সতর্কতা:

০১. নিকলীর হাওর সাধারণ সময়ে শান্ত থাকলেও সামান্য ঝড়ো বাতাস শুরু হলেই এটি হয়ে উঠে উত্তাল,প্রলয়ঙ্করি। তাই ভ্রমণে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

০২.আবহাওয়ার নিম্নচাপ,ঘূর্ণিঝড়-এমন প্রতিকূল পরিবেশে হাওর ভ্রমণে বিরত থাকা উচিত।

০৩.হাওরে যে সব নৌকা চলে সেগুলোতে কোনো লাইফ জ্যাকেট থাকে না। তাই সম্ভব হলে সাথে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে যাওয়া উচিত।

০৪.অনেকে নৌকার গলুই বা ছই এর উপর দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে অনেক ঝুঁকি নেন। এটি খুবই বিপদজনক।

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ