খৈয়াছড়া

যুগের সাথে তালমিলিয়ে চলতে গিয়ে ব্যস্ততার যাতাকলে পড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জীবন। কোথাও ঘুরে আসতে পারলে হালকা লাগতো নিজেকে। কিন্তু সময় কোথায় ঘুরতে যাওয়ার? তার উপরে সরকারি ছুটির দিনগুলো পড়েছে শুক্রবারে। যারা ঘোরাঘুরি করেন এবং প্রকৃতিপ্রেমী তারাও জীবিকা নির্বাহের অথবা সংসার জীবনের কঠিন যাঁতাকলে পড়ে ভ্রমণে যাওয়ার সময় করে উঠতে পারে না। একদিনের ছুটিতে কি আর ঘুরে আসা যায় কোথাও থেকে! ছুটি নেই বলে ঘুরতে যাওয়া হবে না? এ কথা চিন্তাও করতে পারে না একজন ভ্রমণপ্রেমী। ছুটি নেই তাতে কী? একদিনের ছুটি কাজে লাগানো যায় অনেক সুন্দর ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। এক রাতে বেড়িয়ে পড়ুন, গাড়িতে উঠুন, সকালে পৌঁছে যান প্রকৃতির একদম কাছে।

কিন্তু এই একদিনের ছুটিতে যাবেন কোথায়? আপনার কী ঝর্ণা ভালো লাগে? তবে ব্যাগ গুছিয়ে নিন, মিরেরসরাই এর বাস ধরুন। আমার পানি আর পাহাড়ের নেশা অন্যদের ভ্রমণের গল্প শুনে শুনে, বই পড়ে আর ছবি দেখেই হয়। সেই বস্তু আসলেই নেশা নাকি মোহ, যাচাই করে নিতে তাই ভ্রমণের সাথে সখ্যতা হয়েছে বেশ কিছুদিন হলো। ঝর্ণাবিলাসে নিজেকে হারিয়ে জানা গেছে, এ নেশা অনেক গভীর, মোহ নয় মোটেও। ঝিরিপথে হেঁটে চলাতেই মেলে অদ্ভুত প্রশান্তির খোঁজ। পাহাড়ের নির্জনতা এক আদিম সংগীত গেয়ে চলে, তার সুর নিরেট নেশার জাল বুনে দিয়েছে মনের গভীরে। নদীর বুকে দিনভর ভেসে বেড়িয়ে পানির গভীরতায় মুগ্ধতা বেড়েছে আরো শতগুণ।

মিরেরসরাই কেন? আরো তো জায়গা আছে! প্রথম উত্তর হলো, ঝর্ণার প্রতি অফুরান ভালোবাসা। সাঁতার না জানা মানুষদের জন্য পানিতে দাপাদাপি করার পক্ষে ঝর্ণা অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত জায়গা, সেটাও একটা কারণ। আরো একটা উত্তর হলো মিরসরাইয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। এক দিনের ভ্রমণ চাইলে ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা থাকাটা বেশ জরুরি, কেননা আপনাকে এক রাতে যাত্রা করে আলো ফোটার শুরুতেই ভ্রমণের স্থানে পৌঁছুতে হবে, পরের রাতটা ফের যাত্রাপথে কাটিয়ে সকাল সকাল ঘরে ফিরতে হবে। পরের দিনও অবসর থাকলে তো সমস্যা নেই, কিন্তু যদি ফিরে এসেই আপনাকে কাজে কিংবা ক্লাসে ছুটতে হয়, তবে ঘরে ফেরা চাই সাত সকালেই।

বাস থেকে আপনি নামবেন মিরসরাই বাস স্ট্যান্ডে। কাছেই বাজার আছে যেখানে কোনো হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে নিতে পারবেন। বাসের টিকেট কাউন্টার খুললে ফিরতি টিকেট কেটে রাখবেন এ বেলাতেই। রাতে ফিরে টিকেট পাবেন, সেই আশায় বসে থাকা অনুচিত। আলো না ফুটতেই যদি গন্তব্যে পৌঁছে যান, তবে আশেপাশের কোনো চা-দোকানে অপেক্ষা করুন। খৈয়াছড়া ঘুরতে আজকাল গাইড লাগে না, তবে নাপিত্তাছড়ার অলিগলিতে পথ না চিনে ঘুরতে যাবেন না যেন। আর তা চাইলে একবারেই সারাদিনের জন্য গাইড ঠিক করে নিন, কিংবা খৈয়াছড়া ঘুরে নাপিত্তাছড়ায় যাবার পথে স্থানীয়দের গ্রাম থেকে ডেকে নিতে পারেন কাউকে। অনেক ছোট বাচ্চাও আপনাকে কিছু টাকার বিনিময়ে হাসিমুখে ঘুরিয়ে আনবে সম্পূর্ণ ট্রেইল। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত হলে অভিজ্ঞ কাউকেই বেছে নিন গাইড হিসেবে, তাতে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকবেন আপনি।

বাজার থেকেই লেগুনা পেয়ে যাবেন, খৈয়াছড়ার দিকে আরেক ধাপের যাত্রা শুরু হবে তখন। লেগুনা থেকে নেমে গ্রামের ভেতরের পথে পাবেন সিএনজির দেখা। তাতে চড়ে আরো কতখানি পথ পার করে গ্রামের বেশ ভেতরে এলে তবেই শুরু হবে হাঁটার পালা। মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে আর স্থানীয়দের বাড়িঘর দেখে ক্লান্ত হবার চেয়ে বরং উৎফুল্ল হয়ে উঠতে হয়। ঐ মানুষগুলোর মাটির ঘর, উঠোনে সুখ-দুঃখের টুকরো গল্প, বাচ্চাদের উৎসুক নজর আর লাজুক হাসি আপনাকে ছুঁয়ে যাবে ঠিক। এ পথ ধরে হেঁটে কিছু সময় পরেই কানে আসবে ঝর্ণার গর্জন। দেখা পাবেন ঝিরিপথের। মিলিয়ে নেবেন, প্রথমবারের মতো যখন সেই ধ্বনি কানে আসবে, ঘোর লেগে যাবে!

আর অল্প দূরেই ঝর্ণা আছে জেনেও তখন অস্থির লাগবে তাকে দেখার জন্য। শেষ সময়টুক কাটতে যেন আরো অনেক সময় নেবে! আর তারপর ছোট্ট ঝিরিপথের দেখা পেয়ে পানি ছোঁয়ার তৃষ্ণা যখন প্রবল, চোখের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াবে অপরূপ খৈয়াছড়া। প্রথম দর্শনেই নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন তার কাছে। মুগ্ধতার প্রথম ধাক্কা কাটলে জলদি পানিতে নামা চাই, পরের গন্তব্য নাপিত্তাছড়া, নাহলে ভাগে সময় কম পাবে। খৈয়াছড়ায় যত সকালে পৌঁছুতে পারবেন, তত মঙ্গল। সহজে যাওয়া যায় বলে খৈয়াছড়ায় প্রচুর মানুষ বেলা গড়ানোর সাথে সাথে ভিড় জমায়। ঝর্ণায় মনের আঁশ মিটিয়ে গা ভাসানোর সুযোগ নিতে হলে সেই ভিড় এড়ানো চাই। আর প্রকৃতির নির্জনতার মজাই যদি না নেয়া যায়, মন কি পুরো তৃপ্ত হবে?

খৈয়াছড়া সাতটি ধাপের বিশাল এক ঝর্ণা। ধাপ পেরিয়ে উঠতে পারেন যতগুলো সম্ভব। মাটির গা বেয়ে দড়ি ধরে বেয়ে উঠতে আর নামতে গেলে এই ভ্রমণে রোমাঞ্চের মজাও কম মিলবে না। খাটুনিতে শরীর পরিশ্রান্ত হবে বটে, কিন্তু ঝর্ণা আর কুমের একেক রকম রূপ চোখ আর মনে শান্তি আনবে অনেক বেশি। খৈয়াছড়ার পাট চুকিয়ে মন একটু খারাপ করেই হয়তো ফেরার পথ ধরবেন। এ রূপ একবার দেখে কি সাধ মেটে?

যাবার বেলা গ্রামের পথে খাবারের দোকান দেখবেন, নিজেদের দুপুরের খাবারের ফরমায়েশ দিয়ে যাবেন সেখানে। ঝর্ণাস্নান সেরে ফেরার পথে গিয়ে বসলেই খাবার হাজির হয়ে যাবে। ঘরের খাবারের স্বাদে ভাত-তরকারিতে পেট ঠান্ডা হবে এই বেলা। বাঁশের বেড়ার চারপাশ খোলা ছাউনির নিচে বসে অবশ্য তখন যা-ই খাবেন, সব কিছুতেই স্বাদ পেতে থাকবেন।

খাবার সেরে খুশি মন আর ভরা পেট নিয়ে আবার শুরু হবে পথচলা। সেই হাঁটা পথ আবার, আর তা পেরিয়ে সিএনজির জন্য দাঁড়াবেন, তারপর বড় রাস্তায় এসে ফের লেগুনার অপেক্ষা। লেগুনা এবার আপনাকে নিয়ে যাবে নয়দুয়ারী। গন্তব্যে নেমেই দেখা মিলবে গ্রামের রাস্তার। কোনো বাহন নেই সেই পথে। ট্রেইল মূলত এই ঝর্ণাতেই পাবেন। গ্রাম পেরিয়েই শুরু হবে বিশাল নাপিত্তাছড়া ট্রেইল। বুনো গন্ধে ভরপুর একটা অতো বড় পথ, হাঁটতে গিয়েই ঘোরে পড়ে যেতে হয়। ঝিরিপথের সৌন্দর্য কতটা গভীর হতে পারে, কতটা নেশায় জড়ালে মানুষ বারবার ছুটে আসে এমন পথ ধরে হাঁটতে, নাপিত্তাছড়া সেবার আমাদের তাই দেখিয়েছিলো। তুলনামূলক বেশ নির্জন এই ট্রেইলে পথ চলতে পাহাড় আর বনের নিস্তব্ধ আবেশে হারাতে পারেন নিজেকে। পায়ের নিচে শীতল জলের ধারা ক্লান্তিকে শরীরে চেপে বসতে দেয় না।

কুপিকাটা কুম, টিপরা কুম, নাপিত্তাছড়া আর বাঘবিয়ানী- মোট চারটি ছোট-বড় ঝর্ণা এ ট্রেইলের প্রধান সদস্য। চারটিই দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমাদের। সুনসান বিশাল ট্রেইলে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ক্ষণেক্ষণে নিজের মাঝেই হারিয়ে যেতে হয়, প্রতিটি মুহূর্ত ভালোলাগার একেকটা অনুভূতি দিয়ে যায় মনে-প্রাণে, সেই গল্প আসলে শব্দে বর্ণনা করার সাধ্য হয় না পুরো!

টিপরা কুম আর কুপিকাটা কুম আকারে ছোট ঝর্ণা। তাই বলে তাদের বাড়িতে গিয়ে বসতে মানা, তা কিন্তু নয়! একটু বসে জিরিয়ে নেবেন, আরো অনেকটা পথ তখনো বাকি। তাছাড়া অনেকটা পথ উঠতে হয় পাহাড় ডিঙিয়ে, তাতে কিন্তু কম ঝক্কি নেই।

আর তারপরে আপনি যাবেন বড় দুই ঝর্ণা, বাঘবিয়ানী আর নাপিত্তাছড়ার বাড়ি। আমরা আগে বাঘবিয়ানী গিয়েছিলাম। বরফ শীতল ছিলো সেদিন বাঘবিয়ানীর কুমের পানি। তাতে গা ডুবিয়ে দীর্ঘ হাঁটাপথের ক্লান্তি যা-ও বা জমে, দূর হয়ে যায় সমস্তটা। যেন আকাশ থেকে মাথা গলিয়ে নেমেছে এই সুন্দরী ঝর্ণা, প্রথম দেখায় তাকে এরকমই লাগতে পারে। হা করে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখার মত রূপ বটে তার!

বাঘবিয়ানীতে ডুব দিয়ে উঠতে মন না চাইলেও এবার যে উঠতে হবে একটু জলদি। বেলা গড়িয়ে তখন অনেক বেজে যেতে পারে, আর সন্ধ্যা নামলে ঐ গহীন বুনো পথে দিশা হারাতে পারেন আপনি। শেষ ঝর্ণা নাপিত্তাছড়া, যার নামে ট্রেইলের নাম, সে কিন্তু তখনো আপনার অপেক্ষায় আছে। তিনটা ধারা বেয়ে পানি গড়িয়ে এসে ছোট একটা কুমে জমা হয় নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায়। শেষ বেলায় তার বাড়িতে বসে আরেকবার শরীর আর মন ভিজিয়ে নিয়েই শেষ করুন আপনার ঝর্ণাবিলাস।

বেলা থাকতেই ফিরে আসুন গ্রামের পথে। তখন হয়তো সন্ধ্যা নামছে, মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে গিয়ে আপনি পেছন ফিরে তাকাবেন এক-আধবার। দূরে ঐ পাহাড়ের সারি বুকে হাহাকার তুলবে তখন। বিদায় নিচ্ছেন আপনি, বুনো গন্ধের শেষ হতে চলেছে একটু একটু করে। মন খারাপ না করে বরং তখনই সামনের ভ্রমণের জন্য জায়গা ভাবতে থাকুন। কেন বলছি এমনটা? আরে ভাই, এই একটা ঘোরলাগা ভ্রমণের পরে অতো সহজে কি আর আপনার মন শহুরে জীবনে টিকবে! খুব জলদিই আবার বের হবেন আপনি, অন্য কোনো ঝর্ণার দেশে, পাহাড়ের নেশায় নিজেকে বুঁদ করতে তর সইবে না আপনার। মিলিয়ে নেবেন কথাটা!

ব্যাকপ্যাকিং ট্যুর ব্যাপক জনপ্রিয় এই সময়ে। ব্যাকপ্যাকে এক সেট কাপড়, তোয়ালে, শুকনো খাবার আর পানির বোতল, খুব প্রয়োজনের অন্যান্য সামগ্রী আর জরুরি ওষুধের পুঁটুলি গুছিয়ে নিয়েই আজকাল বেরিয়ে পড়া যায় ভ্রমণে। অনেক আগে এমন সময় ছিলো যখন বেড়ানো মানেই ছিলো ভারী সুটকেস, কাপড়ের বস্তা, বিশাল আয়োজন। দিন কিন্তু পাল্টে গেছে! তো আপনি কেন পুরনো ধারণা নিয়ে বসে থাকবেন? বিশাল বহরের চিন্তা ছাড়ুন। দুই-একজন সাথী জুটিয়ে, ব্যাকপ্যাকখানা গুছিয়ে নিয়ে ঝটপট পথে নামুন এবার। শুরু হোক আপনার হুটহাট ভ্রমণের এক অন্য জীবন।

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ