বাংলার নায়াগ্রাঃ নাফাখুম

নাফাখুম! বাংলাদেশের নায়াগ্রা বলে ডাকা হয় বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে অবস্থিত নাফাখুম জলপ্রপাতকে। প্রকৃতি যেনো দুহাত উজাড় করে দিয়েছে এই জলপ্রপাতে। অপরুপ নিদর্শনের এক প্রকান্ড স্থান এই নাফাখুম। বাংলাদেশে যাদের সামর্থ্য হয় না নায়াগ্রা কিংবা ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত ঘুরতে যাওয়ার তারা নাফাখুম ঘুরে স্বাধ মেটান জলপ্রপাত দেখার। যাদের সামর্থ্য আছে তারাও দল বেঁধে চলে যান বাংলাদেশের এই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন দেখতে। আজকের আয়োজনে রইলো বাংলার নায়াগ্রা নাফাখুম ভ্রমনের টুকিটাকি।

নাফাখুমঃ বাংলাদেশে খুব বেশিদিন আগেও মানুষ জানতো না এই জলপ্রপাতের কথা। এইতো এই দশকের শুরুতে, ধীরে ধীরে মানুষ জানতে পারলো নাফাখুমের কথা। এমন আশ্চর্য সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশের বান্দরবানে রয়েছে যেখানে প্রকৃতি কোনো কার্পণ্য করেনি সুন্দরের শুধা ঢেলে দিতে। নাফাখুম দেখতে যতটা সুন্দর ঠিক ততটাই সুন্দর এখানে পৌঁছানোর রাস্তাটি। বান্দরবান জেলাটি এমনিতেই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আলাদা একটি স্থান করে নিয়েছে এর সৌন্দর্যের জন্য। চির হরিৎ এলাকায় এমন একটি জলপ্রপাত বান্দরবানকে করেছে আরো শোভিত। নাফাখুম যেতে হলে গাড়ি, নৌকা এবং পায়ে হাটা পথে পৌঁছাতে হয়। সাঙ্গু নদীর অববাহিকা ধরে নৌকা দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে পার হতে হয় রেমাক্রি। রেমাক্রি থেকে হাঁটা পথে প্রায় ৩ ঘন্টা পরে দেখা পাওয়া যায় এই অনন্য সুন্দর জলপ্রপাতের। রেমাক্রি খালের পানি নাফাখুমে এসে বাঁক খেয়ে প্রায় ২৫-৩০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে এই অনিন্দ্য সুন্দর নাফাখুম জলপ্রপাত। ভ্রমনকারীরা এই পথে এসে একই সাথে ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন।

কিভাবে যাবেনঃ দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমেই যেতে হবে বান্দরবান। ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার অনেকগুলো পরিবহণ আছে। বান্দরবানে যাওয়ার একমাত্র বাহণ বাস। নদী পথে বা আকাশপথে সরাসরি বান্দরবান যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তারপর বান্দরবান থেকে থানচি, থানচি থেকে নৌকায় সাঙ্গু নদীপথে রেমাক্রি বাজার যেতে হবে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে নাফাখুম যেতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে এস. আলম, ইউনিক, হানিফ, শ্যামলি, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দারবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জনপ্রতি এসব বাসের ভাড়া যথাক্রমে নন এসি ৫৫০-৬৫০ টাকা ও এসি ৯৫০-১৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্রগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বান্দরবান যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে প্রতিদিনই সোনার বাংলা, সুবর্ণ, মহানগর ইত্যাদি ট্রেন চটগ্রাম যায়। শ্রেনী ভেদে ভাড়া ৩২০-১৫০০ টাকা। চট্টগ্রামের বদ্দারহাট বাস স্টেশন থেকে বান্দরবানে যাওয়া যায়। পূবালী ও পূর্বানী নামের দুটি বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এ দুটি বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া লাগে। এছাড়া ধামপাড়া বাস স্টপেজ থেকে বান্দরবান যাওয়া যায়। চাইলে রেন্ট এ কারে করেও চট্রগ্রাম থেকে বান্দরবান যাওয়া যাবে সেক্ষেত্রে মাইক্রোবাসের ভাড়া ২,৫০০-৩,৫০০ টাকা। বান্দরবান যাওয়ার পরে যেতে হবে থানচি উপজেলায়। বান্দরবান থেকে থানচি উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৭৯ কিলোমিটার। বান্দরবান থেকে থানচি যাওয়া যায় দুইভাবে; বাসে কিংবা রিজার্ভ জীপে। বান্দরবানের থানচি বাস স্ট্যান্ড থেকে এক ঘণ্টা পর পর লোকাল বাস থানচির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জনপ্রতি বাস ভাড়া ২০০ টাকা, সময় লাগবে ৪-৫ ঘন্টা। রিজার্ভ জীপ/চান্দের গাড়িতে গেলে খরচ হবে ৫,৫০০-৬,০০০ টাকা, সময় লাগবে ৩-৩.৫ ঘন্টা। এক গাড়িতে ১২-১৪ জন অনায়াসে যাওয়া যায়। থানচি যাওয়ার সময় পথে পরবে মিলনছড়ি, চিম্বুক পাহাড় ও নীলগিরি। থানচি থেকে যেতে হবে রেমাক্রি ইউনিয়নে। থানচি পৌঁছে অবশ্যই একজন গাইড ঠিক করতে হবে। গাইড ছাড়া নাফাখুম ভ্রমণে যাওয়া যাবে না। উপজেলা প্রসাশন থেকে অনুমতি পাওয়া যে কাউকে গাইড হিসেবে নেওয়া যাবে। সাথে গিয়ে পরদিন থানচি ফিরে আসা পর্যন্ত গাইড ফি ১৫০০টাকা। গাইড ঠিক করার ব্যাপারটা থানচি গিয়েও করা যায় অথবা আগে থেকে পরিচিত কোন গাইডকে কথা বলে ঠিক করে রাখা যায়। গাইড ঠিক করার পর থানচি বিজিবি ক্যাম্প/থানা থেকে অনুমতি নিতে হবে। ভ্রমণকারী সকল সদস্যের নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার, কোথায় যাবে, কয়দিন থাকবে এইসব তথ্য কাগজে লিখে জমা দিতে হবে। আর এইসব কাজে গাইড সাহায্য করবে। বিকেল ৩ টার পর থানচি থেকে রেমাক্রি যাবার অনুমতি দেওয়া হয় না। তাই সেইদিনই রেমাক্রি যেতে চাইলে অবশ্যই ২টার মধ্যে থানচি থাকতে হবে। তা না হলে ঐদিন থানচি থেকে পরদিন সকালে রেমাক্রি যেতে হবে। অনুমতি পাওয়ার পর থানচি ঘাট থেকে ছোট ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করতে হবে। এক নৌকায় ৪-৫ জন যাওয়া যাবে। রেমাক্রি পর্যন্ত নৌকা রিজার্ভ যাওয়া ও পরদিন আসা সহ ভাড়া ৪,০০০-৫,০০০ টাকা। যেতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। সাঙ্গুতে পানি কম থাকলে কিছু জায়গায় নৌকা থেকে নেমে হেঁটে যেতে হবে তখন সময় একটু বেশি লাগতে পারে। পথেই পরবে পদ্মমুখ, ভূ-স্বর্গ খ্যাত তিন্দু, রাজাপাথর বড়পাথর এলাকা ও রেমাক্রি ফলস। গাইড এর যাওয়া, থাকা খাওয়া ও অন্যান্য খরচও নিজেদের বহন করতে হবে। এরপরই আসবে সেই অনিন্দ্য সুন্দর নাফাখুম যাওয়ার পালা। সাধারণত খুব সকালে বান্দরবান থেকে রওনা দিলে রেমাক্রি পৌছাতে বিকেল হয়ে যায়। সেইদিন আর নাফাখুম যাওয়া সম্ভব হয় উঠে না। সেই রাত রেমাক্রি বাজার থেকে পরদিন সকালে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। রেমাক্রি থেকে স্থানীয় আরও একজন গাইড ৫০০ টাকা দিয়ে নিতে হবে। থানচি থেকে আসা গাইডই ঠিক করবে। রেমাক্রি থেকে রেমাক্রি খাল ধরে হেঁটে নাফাখুম যেতে সময় লাগে ২-৩ ঘন্টা। তবে সময় কত লাগবে তা নির্ভর করবে ভ্রমণকারী সঙ্গীদের হাঁটার গতির উপর আর মৌসুনের উপর। বর্ষায় রেমাক্রি খালে পানি অনেক বেশি থাকে। কোথাও কোমর পানি কিংবা কোথাও আরও বেশি। কিছু জায়গায় রেমাক্রি খাল এপার ওপার করতে হবে। পানি বেশি থাকলে এই পারাপারে সময় বেশি লাগবে। এইসব জায়গায় গাইড সাহায্য করবে।

কোথায় থাকবেনঃ নাফাখুমে রাত কাঁটানোর মতো জায়গা নেই। তবে রেমাক্রিতে আদিবাসিদের বাসায় থাকার ব্যবস্থা আছে। থানচিতে ভালো কোথাও থাকতে চাইলে বিজিবি নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত অবকাশ কেন্দ্রে থাকা যাবে। রুম ভাড়া ১৫০০-৩০০০ টাকা এর মধ্যে। এছাড়া থানচি বাজার ও আশেপাশে কিছু কটেজ ও রেস্টহাউজ ধরণের হোটেলে থাকার ব্যবস্থা আছে। মান অনুযায়ী দিন প্রতি ভাড়া ২০০-১০০০ টাকার মধ্যে। রেমাক্রি বাজারে আদিবাসীদের ঘরে থাকার ব্যবস্থা আছে। সাঙ্গু নদীর পাশে আদিবাসীদের রেস্ট হাউজে কয়েকজন মিলে থাকতে হলে জনপ্রতি ভাড়া লাগবে ১৫০ টাকা।

কি খাবেনঃ নাফাখুমে খাওয়ার মতো বিশেষ কিছু নেই। তবে আদিবাসিদের বাসায় থাকার সুবাদে তাদের রান্না করা খাবার খেতে পারবেন। অবশ্য ওখানে খেতে হলে আগে থেকে বলে রাখতে হবে। থানচি বাজারে মোটামুটি মানের কিছু খাওয়ার হোটেল আছে। রেমাক্রিতে আদিবাসী বাড়িতেই খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আগে থেকে বলে রাখলেই হবে। অনেকটা প্যাকেজ সিস্টেমে খাওয়ার ব্যবস্থা। সাধারণত ভাত, ভর্তা, ভাজি ও ডিম খেতে খরচ হবে ৮০ টাকা, ডিমের বদলে মুরগি খেতে চাইলে খরচ হবে ১২০ টাকা। আগে থেকেই গাইডকে দিয়ে জানিয়ে রাখতে হবে কি খাবেন ও কতজন খাবেন।

টিপসঃ নাফাখুমের আসল রুপ দেখা যায় ভরা বর্ষায়। কিন্তু বর্ষায় রেমাক্রি খালের পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার কারণে বিজিবি অনুমতি দেয় না যাওয়ার। তাই বর্ষার শেষে এবং শীতের আগে আগে নাফাখুম দেখতে যাওয়া সর্বোত্তম। পাহাড়ি পথ হওয়ায় এই পথে যতটা সম্ভব হালকা থাকার চেষ্টা করা উচিৎ। ভারী ব্যাগ নিয়ে যাতায়াত করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

বাংলার নায়াগ্রা বা অন্য যে নামেই ডাকা হোক না কেন, নাফাখুমের সৌন্দর্য অন্যকোনো কিছুতেই বর্ণনা করা সম্ভব না। এই অনিন্দ্য সুন্দর ভ্রমন স্থান বাংলাদেশে খুব কম আছে। তাই দেরি না করে গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ আর রওনা দিয়ে দিন নাফাখুমের উদ্দেশ্যে। তবে খেয়াল রাখবেন! আপনার দ্বারা যেনো পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। হ্যাপি ট্রাভেলিং

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ