চন্দ্রনাথ মন্দিরঃ সনাতন ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড থানার চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির। সীতাকুন্ড বাজার থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে চন্দ্রনাথ পাহাড়। এই পাহাড়ের একদম চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির হিন্দু ধর্মালম্বীদের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানে হিন্দু পবিত্র গ্রন্থসমূহ অনুসারে সতী দেবীর দক্ষিণ হস্ত পতিত হয়েছিল। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির তীর্থযাত্রীদের জন্য এক পবিত্র স্থান। এর পুরনো নাম ছিলো “সীতার কুণ্ড মন্দির”। সীতা মন্দিরের কাছে একটি ঝর্ণা আছে যা শুকিয়ে গেছে। আজকের আয়োজন হিন্দু ধর্মের এই তীর্থস্থানকে নিয়ে।

চন্দ্রনাথ মন্দিরঃ রাজমালা অনুসারে প্রায় ৮০০ বছর পূর্বে গৌরের বিখ্যাত আদিসুরের বংশধর রাজা বিশ্বম্ভর সমুদ্রপথে চন্দ্রনাথে পৌঁছার চেষ্টা করেন। ত্রিপুরার শাসক ধন মানিক্য এ মন্দির থেকে শিবের মূর্তি তার রাজ্যে সরিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা করে ব্যর্থ হন। বিভিন্ন তথ্য অনুসারে এখানের ইতিহাস সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য জানা যায়। প্রাচীন নব্যপ্রস্তর যুগে সীতাকুণ্ডে মানুষের বসবাস শুরু হয় বলে ধারনা করা হয়। এখান থেকে আবিষ্কৃত প্রস্তর যুগের আসামিয় জনগোষ্ঠীর হাতিয়ারগুলো তারই স্বাক্ষর বহন করে। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দীতে সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিল। এর পরের শতাব্দীতে এই অঞ্চলের শাসনভার চলে যায় পাল সম্রাট ধর্মপালের হাতে। সোনারগাঁওয়ের সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ্ ১৩৪০ খ্রীষ্টাব্দে এ অঞ্চল অধিগ্রহন করেন। পরবর্তীতে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে সুর বংশের শের শাহ্ সুরির নিকট বাংলার সুলতানি বংশের শেষ সুলতান সুলতান গীয়াস উদ্দীন মুহাম্মদ শাহ্ পরাজিত হলে এই এলাকা আরাকান রাজ্যের হাতে চলে যায় এবং আরাকানীদের বংশধররা এই অঞ্চল শাসন করতে থাকেন। পরবর্তীতে পর্তুগীজরাও আরাকানীদের শাসনকাজে ভাগ বসায় এবং ১৫৩৮ খ্রী: থেকে ১৬৬৬ খ্রী: পর্যন্ত এই অঞ্চল পর্তুগীজ ও আরাকানী বংশধরেরা একসাথে শাসন করে। প্রায় ১২৮ বছরের রাজত্ব শেষে ১৯৬৬ খ্রী: মুঘল সেনাপতি বুজর্গ উন্মে খান আরাকানীদের এবং পর্তুগীজদের হটিয়ে এই অঞ্চল দখল করে নেন।

এখানের সর্বোচ্চ পাহাড় চুড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির। আরো রয়েছে বড়বাজার পূজামণ্ডপ, ক্রমধেশ্বরী কালী মন্দির, ভোলানন্দগিরি সেবাশ্রম, কাছারীবাড়ী, শনি ঠাকুর বাড়ী, প্রেমতলা, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রাহ্মচারী সেবাশ্রম, শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, গিরিশ ধর্মশালা, দোল চত্বর, এন,জি,সাহা তীর্থযাত্রী নিবাস, তীর্থ গুরু মোহন্ত আস্তানা, বিবেকানন্দ স্মৃতি পঞ্চবটি, জগন্নাথ আশ্রম, শ্রীকৃষ্ণ মন্দির, মহাশ্মশানভবানী মন্দির, স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিগয়াক্ষেত্, জগন্নাথ মন্দির, বিরুপাক্ষ মন্দির, পাতালপুরী, অন্নপূর্ণা মন্দির ইত্যাদি।

শিবরাত্রি তথা শিবচর্তুদশী তিথিতে বিশেষ পূজা হয়; এই পূজাকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে বিশাল মেলা হয়। সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকায় বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সাংবার্ষিক ফাল্গুন মাসে (ফেব্রুয়ারী-মার্চ) বড় ধরনের একটি মেলার আয়োজন করে থাকে। মেলাটি শিবচতুর্দশীর মেলা নামে পরিচিত যা বেশ বড় ধরনের মেলা। এই মেলায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য সাধু-সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থী নারী-পুরুষ যোগদান করেন। তখন এলাকাটি জনাকীর্ণ আকার ধারণ করে।

কিভাবে যাবেনঃ দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড বাজারে যেতে হবে। বাজার থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়। এই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হিন্দুদের এই পূণ্যস্থান। ঢাকা থেকে এস.আলম, সৌদিয়া, গ্রীনলাইন, সিল্ক লাইন, সোহাগ, বাগদাদ এক্সপ্রেস, ইউনিক প্রভূতির বাস সীতাকুণ্ডে থামে। চট্টগ্রাম থেকে বাসগুলো মাদারবাড়ী, কদমতলী বাসষ্টেশন থেকে ছাড়ে। তা ছাড়াও অলঙ্কার থেকে কিছু ছোট গাড়ী ছাড়ে (স্থানী ভাবে মেক্সী নামে পরিচিত)। সেগুলো করেও আসা যাবে। এছাড়া ঢাকা থেকে আসা দ্রুতগামী ট্রেন “ঢাকা মেইল” সীতাকুণ্ডে থামে, এটি ঢাকা থেকে ছাড়ে রাত ১১টায় এবং সীতাকুণ্ডে পৌঁছে পরদিন সকাল ৬.৩০ থেকে ৭টায়। অন্যান্য আন্তঃ নগর ট্রেন গুলো সরাসরি চট্টগ্রামে চলে যায়। শুধুমাত্র শিবচতুর্দশী মেলার সময় সীতাকুণ্ডে থামে।

কোথায় থাকবেনঃ থাকার জন্য সীতাকুন্ডে ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই থাকতে হলে চলে যেতে হবে চট্টগ্রাম শহরে। সেখানে অনেকগুলো হোটেল আছে। ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়ায় হোটেলে রুম পাওয়া যায়। প্রয়োজন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন আপনার জন্য রুম।

কি খাবেনঃ খাওয়ার জন্য চন্দ্রনাথ পাহাড় বা মন্দিরে কোনো ব্যবস্থা নেই। খেতে হলে সীতাকুন্ড বাজারে আসতে হবে। সেখানে কিছু হোটেল আছে খাওয়ার জন্য। যেখানে মোটামুটি সবকিছুই পাওয়া যায় খেতে। অথবা চট্টগ্রাম শহরে এসে পছন্দমতো যেকোনো হোটেলে বসে যেতে পারেন এবং পেটের ক্ষুধা মেটাতে পারেন।

টিপসঃ চন্দ্রনাথ মন্দিরটি পাহাড়ের চূড়ায় হওয়ায় সেখানে পৌঁছানো একটু কষ্টসাধ্য। তাই ভারী কিছু সাথে না নিয়ে যাওয়াই ভালো। এছাড়া পাহাড়ে ওঠাও স্বাভাবিকের চেয়ে একটু কঠিন। তাই মানষিক প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া ভালো। হিন্দু ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান এই মন্দির। প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী বেড়াতে যায় এই জায়গায়। হিন্দু ধর্মের পূণ্যস্থান হওয়ায় জায়গাটি খুবই সংবেদনশীল। খেয়াল রাখতে হবে, সেখানে গিয়ে এমন কোনো আচরণ যেনো না করা হয় যা ধর্মীয় ভাবে আক্রমনাত্মক। আর হ্যাঁ! খেয়াল রাখবেন আপনার হাতে যেনো পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। হ্যাপি ট্রাভেলিং

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ