বিরিয়ানির পথিকৃৎঃ নান্না বিরিয়ানি

পুরান ঢাকা কিসের জন্য বিখ্যাত? কেউ বলবেন আহসান মঞ্জিল, বুড়িগঙ্গা, লালবাগ কেল্লা আবার কেউ বলবেন রোজ গার্ডেন কিংবা ভিক্টোরিয়া পার্কের কথা। কিন্তু একজন খাদ্য রসিকের কাছে পুরান ঢাকা মানে একটা স্বর্গ রাজ্য। এখানকার খাবার দাবারের নাম শুনেনি এমন মানুষ নেই বললেই চলে। হাজির বিরিয়ানি, নান্নার বিরিয়ানি, বিউটির লাচ্ছি, বাকরখানি! এত এত রসনার ভিড়ে প্রয়োজনের জন্য খাওয়া মানুষটিও খাদ্য প্রেমিক হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। আমাদের আজকের আয়োজনে থাকছে ঐতিহ্যবাহি হাজি নান্না মিয়ার বিরিয়ানির আদ্যেপান্ত।

“নান্না বিরিয়ানি” এর নাম শুনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। এই রেস্তোরার মতো মোরগ পোলাও বাংলাদেশের আর কোথাও বানাতে পারে কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। তবে নান্না মিয়ার মোরগ পোলাওয়ের স্বাদ ঢাকার আর যেকোনো ব্র্যান্ডের মোরগ পোলাওয়ের চেয়ে আলাদা। মোরগ-পোলাওয়ের এর ঝোলের স্বাদ এককথায় অতুলনীয়। সেই সাথে এদের বোরহানীটাও মজার। নান্নার বিরিয়ানি নামটা একটি জনপ্রিয় র‍্যাপ গানের মধ্যেও উল্লেখ আছে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা নান্না মিয়া ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে শুরু করেন বিরিয়ানির ব্যবসা। মানুষের কাছে তার বিরিয়ানি ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর ১৯৭৩-৭৪ সালে মৌলভীবাজারের বেচারাম দেউরিতে এর প্রধান শাখা খুলে ব্যবসাকে একটু বড় রূপ দেন এই নান্না বাবুর্চি। হাজী নান্না মিয়ার মৃত্যুর পর আজ অব্দি তার পরিবারে সদস্যরা এ ব্যবসার হাল ধরে আছেন।

নান্না বিরিয়ানির মোট ৫টি শাখা রয়েছে। ৪টি শাখাই পুরনো ঢাকায় অবস্হিত। কিন্তু প্রথম এবং মূল দোকানটির সাথে এর শাখাগুলোর রান্নার কিছু পার্থক্য মনে হতে পারে। তাই এর ‘আসল’ স্বাদ নিতে চাইলে যেতে হবে বেচারাম দেউরীতে অবস্হিত মূল রেস্তোরায়। তারা মসজিদ থেকে নান্না বিরিয়ানি দেখা যায়।

রোজার মাসে নান্না বিরিয়ানিতে ক্রেতাদের বাড়তি চাপ থাকে। ইফতারি আইটেম আয়োজনের কোন ভিন্নতা থাকে না। বছরের অন্য সব দিনে যে আইটেমগুলো পাওয়া যায় রোজায় সেগুলোই থাকে। তবে সাধারণের চাইতে রোজার সময় বিক্রি হয় তার তিনগুন! এখানে মুলত পোলাও ও মোরগের রোস্ট এবং মোরগ পোলাও এই দুই প্রকারের শাহী মোরগ পোলাও পাওয়া যায়। খাসির বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও একইরকম আইটেম বিদ্যমান। তবে এখানে বলে রাখা ভালো আলাদা পোলাও মোরগের রোস্ট আইটেমটা বিশেষ ঘ্রাণ ও স্বাদ বহন করে। যা রসনা বিলাসীদের বারবার এখানে টেনে নিয়ে আসবে। এ ছাড়াও এখানে পাওয়া যাবে মাটন কাচ্চি, তেহারী, টিকিয়া। খাবারের পর ডেজার্ট হিসেবে পাওয়া যায় ফিরনি। আরও আছে বোরহানি,ও লাবাং-এর মত অতি সুস্বাদু পানীয়।

বহু আগে থেকেই কাচ্চির সাথে সাথে মোরগ পোলাও বা চিকেন বিরিয়ানি বিক্রি করা হয়। নান্না তখনকার ঢাকার বিখ্যাতা পেয়ারা বাবুর্চির অধীনে রান্নার কাজ শেখা শুরু করেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে নান্না বাবুর্চির কাজ শুরু করেন ১৯৫২ কি ১৯৫৩ সালে। তখন ঢাকার মৌলভীবাজারে সর্বপ্রথম মোরগ পোলাও বিক্রি করতেন।

বাসা থেকে কয়েকটা মোরগ আর এক হাঁড়ি পোলাও নিয়ে বসতেন ছোট্ট একটি দোকানে। চাটাইয়ে বসে খেত লোকজন। প্রতি প্লেটের দাম ছিল দুই টাকা। সে সময় মোরগ পোলাওয়ের সঙ্গে আলাদা কোনো ঝোল দেওয়া হতো না। শুধু পোলাও ও রোস্টের সঙ্গে থাকত সুস্বাদু ঝোল। ভোজনরসিক পুরান ঢাকার মানুষদের মধ্যে নান্নার রান্নার সুনার ছড়িয়ে পড়ে।

কালের বিবর্তনে এখন নান্নার বিরিয়ানির দাম বেড়েছে। কিন্তু স্বাদ আছে ঠিক আগের মতোই। নান্না বিরিয়ানিতে এখন এক প্লেট খাশির মাংস দিয়ে করা কাচ্চি ১৯০ টাকা, খাশির বিরিয়ানি ১৫০ টাকা, মোরগ পোলাও ১৪০ টাকাতে বিক্রি হয়। প্রতি মাসের ৫ তারিখে আস্ত মুরগির বিরিয়ানি বিক্রি করা হয়। এছাড়া কাবাব পাওয়া যায়। একটি কাবাব ৩০ টাকায় খেতে পারবেন এখানে। কাচ্চি কিংবা বিরিয়ানি খেতে খেতে পিপাসা লাগছে? এখানে পাবেন সুস্বাদু বোরহানি এবং লাবাং। ১২০ টাকায় এক লিটার বোরহানি পাওয়া যায় যা অন্যান্য জায়গা থেকে এখনো অনেক কম দামে বিক্রি হয়ে থাকে।

ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে, মিরপুর বেনারসি পল্লীতে আর মতিঝিলে একটি করে শাখা এবং পুরান ঢাকার বেচারাম দেউরীতে প্রধান শাখা নিয়ে মানুষের রসনা বিলাসের যোগান দিয়ে যাচ্ছে নান্না’র বিরিয়ানী হাউজ। পুরান ঢাকার বেগম বাজারে গেলে কমিশনার কার্যালয়ে যাওয়ার পথে তিন রাস্তার মোড়েই পেয়ে যাবেন নান্না’র প্রধান শাখা। আর শাপলা চত্বর থেকে ৩০০ গজ দক্ষিণে হাটলেই বঙ্গভবনের ৪নং গেটের বিপরীতেই পাওয়া যাবে নান্নার মতিঝিল শাখা। তবে নাজিমুদ্দিন রোডের শাখাতে যেতে হলে শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ থেকে সোজা যেতে হবে চানখার পুলের দিকে। পথিমধ্যে হোসনি দালানের প্রবেশ মুখেই পাওয়া যাবে নাজিমুদ্দিন রোডের নান্না মিয়ার বিরিয়ানি হাউজের এ শাখাটি। মিরপুর ১০ নং গোলচক্কর সংলগ্ন বেনারসি পল্লী গেইট নং ১ দিয়ে প্রবেশ করলে পাঁচ মিনিট হাটলেই ডান পাশে নান্না মিয়ার বিরিয়ানি হাউজের শাখাটি পাওয়া যাবে।

এ জাতীয় আরও প্রবন্ধ